Tuesday, 5 July 2011

প্রস্তাবিত পানি আইন: নিছক ব্যবসায়ের জন্য নয়, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় হোক

পানি; প্রাণ ও প্রকৃতির


শুধু মানুষই নয়, পানি সকল প্রাণ ও প্রকৃতির অধিকার। পানি ছাড়া কোন প্রাণীই বাঁচতে পারে না। পানি প্রকৃতির দান,এটা কেউ তৈরি করেনি। তাই পানিকে কোনভাবেই বানিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। পানি বিষয়ক আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকেই নয়, প্রাণ ও প্রকৃতির স্বার্থ-অধিকারকে প্রাধান্য দিয়েই হতে হবে।


শুধুমাত্র পানির উৎস ব্যবস্থাপনা কিংবা সরবারহের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রণীত নীতি ও আইনের মাধ্যমে পানির সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। পরিবেশের অন্যতম এই উপাদানটি রক্ষায় পুরো পানি চক্রটিকে প্রাধান্য দিয়েই পানি নীতি ও আইন তৈরি করতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ তাদের প্রয়োজন, ভৌগলিক অবস্থান,সামাজিক অবস্থা, রীতিনীতি ঐতিহ্য ও জনগণের আশা-আকাঙ্খা এবং স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে আইন তৈরি করেছে । ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সদ্ব্যবহার এবং সংরক্ষণ দরকার ।

প্রস্তাবিত খসড়া পানি আইন: সরকারের ক্ষমতা ও জনগনের স্বার্থ

ঋণপ্রদানকারী সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-র অর্থায়নে তৈরি করা হয়েছে খসড়া পানি আইন। আইনটি সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে।। প্রস্তাবিত এ আইনের খসড়ায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের প্রস্তাব এনে বিকেন্দ্রিকরণ নীতির আড়ালে পানি ও পানির উৎসসমূহকে বেসরকারি খাতে সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত পানি আইনে লাইসেন্সের বিধানের মাধ্যমে জনগণের অধিকারকে বাণিজ্যিক মোড়কে রূপান্তর করে আইনসিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। লাইসেন্সের এ বিধান পানি শুধু ব্যবস্থাপনা নয়,নিয়ন্ত্রণকে আইনসিদ্ধ করার প্রচেষ্টা। এর ফলে আইনে প্রাণ ও প্রকৃতির অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে। পানি জনগণেরই সম্পদ। এ আইনের মূলনীতিতে সেই পানিতে জনগণের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে, যা সংবিধান ও মানবাধিকার পরিপন্থী।

পানিকে বাণিজ্যিক পণ্য এবং রাজস্ব আয়ের উপকরণ হিসেবে না দেখে জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থে ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সম্পদ হিসেবে আইনে পানিকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। লিজিংয়ের মাধ্যমে পানিকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে না নিয়ে আইন ও নীতির মাধ্যমে পানির উপর মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ দরকার। ব্যবসায়িক খাতের নিয়ন্ত্রণাধীন পন্যগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সরকার হিমসিম খেতে হচ্ছে। সেখানে পানির মতো একটি মৌলিক প্রয়োজনীয় পন্যের বানিজ্যিকিকরণ সরকারের ক্ষমতাকে সংকুচিত করবে এবং জনগনের অধিকারকে ক্ষুন্ন করবে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় পানি অধিকার যেভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে:
১. পানিকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। প্রতিটি নাগরিকের নিকট প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি পৌছে দেয়ার বাধ্যবাধ্কতা প্রদান করা হয়নি।
২. পানির উপর প্রকৃতির অধিকার অর্থাৎ অন্যান্য প্রানীর অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি।
৩. পানির উপর বেসরকারি কোম্পানির ক্ষমতা ও অধিকারকে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
৪. পানিকে সরকারের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে,জনগনের নয়।
৫. হাওর ও সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকায় পানি ও জীববৈচিত্র্যকে আইনে সংরক্ষিত করা হয়নি।
৬. প্রাকৃতিক পানির আধারগুলোর উপর বেসরকারি কোম্পানির অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ উম্মুক্ত করা হয়েছে।
৭. আইনটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নগরের কথা বিবেচনা করে প্রণীত। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন আচারের কথা বিবেচনা করা হয়নি।
৮. খাল-বিল,নদী-নালা এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর বা জলাশয় থেকেও সাধারণ গৃহস্থালীর কাজের অতিরিক্ত (ঘর ধোয়া) পানি ব্যবহার করলে লাইসেন্স নেয়ার কথা বলা হয়েছে। যা জনগনের অধিকারকে ক্ষুন্ন করবে।

পানির উপর বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
এ আইনের ফলে পানি সরবারহ,পানি উৎস ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ সকল ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। কোম্পানিকে লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে পানির সংরক্ষণের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। যার ফলে পানির দাম বৃদ্ধি,কৃত্রিম সংকটসহ নিয়ন্ত্রণ কোম্পানির হাতে চলে যাবে এবং পানি বাণিজ্যিক রূপ ধারন করবে। নাগরিকের নূন্যতম পানি সরবারহের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা না থাকা কিংবা বিনামূল্যে বস্তিবাসী, সুবিধা বঞ্চিত মানুষ পানি অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। পানি সরবারহে কোম্পানির সুযোগ বৃদ্ধি করার ফলে রাষ্ট্রীয় সরবারহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আওতা সীমিত হয়ে পড়েবে। পানির উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করতে চাইলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নির্দিষ্টি অংকের ফি জমা দিয়ে পানি সম্পদ কাউন্সিলের নির্বাহি কমিটিতে আপিল করতে হবে।

সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য গণ্য করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের (Right to life) কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি ছাড়া জীবনধারণ অসম্ভব। তাই জীবনের অধিকার বলবৎ করতে চাইলে অবশ্য বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশুদ্ধ ও জীবাণুমুক্ত পানি পাওয়ার অধিকারকে তাই পরোক্ষভাবে বলা যায়, জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। সে অধিকার বাস্তবায়নে সরকার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা দেখাবে এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নিবে এটাই এখন জনগণের প্রত্যাশা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পানি-পরিস্থিতি
কেনিয়ার উত্তরাঞ্চলে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। একেক জনকে দিনে ৫ ঘণ্টা এই কাজে ব্যয় করতে হয়। ইনডিয়া, পাকিস্তানে বহু অঞ্চল আছে যেখানে একটি জলাশয় বা কূপ থেকে পানি সংগ্রহের জন্য দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসে,এর কোন বিকল্প নেই। সৌদি আরব,সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ দূর করে সুপেয় পানির যোগান দিচ্ছে। একই দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন প্রদেশ বা রাজ্যের মধ্যে পানি নিয়ে বিরোধের নজির রয়েছে। ইনডিয়ার কর্নাটক এবং তামিলনাড়– রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধে বড় ধরনের দাঙ্গা পর্যন্ত সংগঠিত হয়েছিল।

পানি বেসরকারিকরণের অভিজ্ঞতা
পানি বেসরকারিকরনের ফলে বিশ্বে পানি ব্যবসার পেছনে ১০টি কোম্পানীর বিনিয়োগ ৪০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ১০টি কোম্পানির সবই ব্রিটেন,ফ্রান্স,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জর্মানির। ইনডিয়া,বলিভিয়া,চিলি,আর্জেন্টিনা, মালয়েশিয়া,অস্ট্রেলিয়া,যুক্তরাজ্য,দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন শহরে পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকানি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রকেটে গতিতে পানির দাম বৃদ্ধির ফলে অনেক দেশে মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে।

১৯৯০ সালের শুরু থেকে বিভিন্ন দেশে পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পালা শুরু হয়। আর এর পিছনের শক্তি হিসেবে কাজ করে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ। বিভিন্ন দেশে লোন সহায়তা,উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় পানি সেবা ব্যবস্থাপনাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ২০০০ সালে আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের অঙ্গসংস্থা আইএফসি’র মাধ্যমে ৪০টি লোন রিলিজ করে। এর মধ্যে ১২টি লোন প্রকল্পের শর্ত ছিল আংশিক বা পুরোপুরিভাবে পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া। বিশ্বব্যাংকের চাপে পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া এবং পানি নিয়ে গণ-আন্দোলনের উদাহরন বলিভিয়া। বলিভিয়ার কোচবাম্বা এলাকাটি মরূপ্রধান । পানি সেখানে খুব দুস্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য। কোচবাম্বা পৌর এলাকার পানি সরবাহকারী সংস্থা সেনিয়াপাকে বেসরকারি করার জন্য চাপ দেয় বিশ্বব্যাংক। ব্যাংক কর্মকর্তারা সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন,যদি কোচাম্বার পানি সরবারহ সংস্থাকে বেসরকারিকরন না করা হয় তাহরে ৬০ কোটি ডলারের ঋণ তুলে নেয়া হবে।

বিশ্বব্যাংকের চাপে বলিভিয়া ১৯৯৯ সালে পানি আইন পাস করে। পানি আইনে পানি খাতকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পৌর এলাকার পানিতে সরকারি ভর্তুকি প্রদানও বন্ধ করা হয়। কোচাম্বার পানি সরবারহের দাযিত্ব পায় য়ুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর কোম্পানি বেচটেল। বেসরকারি মার্কিন সংস্থার কাছে পানি সরবারহের দেয়ার সাথে সাথে মাসে পানির বিল ২০ ডলারে পৌছে যায়- যেখানে সাধারন মানুষের মাসিক নুন্যতম বেতন ছিল মাত্র ১০০ ডলার। পানির এই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে নগরবাসি রাজপথে নামে ২০০০ সালে। কোচাম্বার দোকান-পাট চারদিন বন্ধ রাখা হয়। এরপর ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয় এবং সব যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেয়া হয়। পিপসার্ত উত্তাল জনতার রোষ মোকাবেলায় সরকার সামরিক আইন জারি করে এপ্রিল মাসে। গুলিতে ৬জন নিহত হয়। শত শত আন্দোলন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। অবশেষে বেচটেল বলিভিয়া থেকে পলায়ন করে।

বিশ্বের ১৪০টি দেশে বেচটেলের ১৯ হাজার প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ২০০টিই পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত। ভারতের বিশ্বনাথ নদী ছত্রিশগড় শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন এবং পানি পরিশোধন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। এর ফলে রেল কলোনির লোকদের দিনে মাত্র ৪ লিটার পানি দেয়া হতো এবং প্রতি লিটারের জন্য ১২ রুপি ৬০ পয়সা দিতে হতো। জনসাধারনকে নদীতে গোসল এবং মাছ ধরার অনুমতিও দেয়া হতো না।

পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পর যুক্তরাজ্যে পানির দাম ৪৫০গুন বেড়ে যায়,বেসরকারি পানি সরবারহ কোম্পানির লাভ বাড়ে ৬৯২গুন। আর ওই কোম্পানি নির্বাহী কর্মকর্তার বেতন বাড়ে ৭০৮গুন। ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসেসিয়েশন বেসরকারি খাতে পানি সরবারহের দায়িত্ব প্রদানকে নিন্দা জানিয়ে বলেছে,এর ফলে মানুষের আমাশয় আক্রান্ত হওয়ার হার ছয়গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্সে পানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পর পানির ফি ১৫০ শতাংশ বেড়ে যায়,অন্যদিকে কমতে থাকে পানির মান। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,৫২ লাখ মানুষ দূষিত পানি পেয়েছে কোম্পানি থেকে।

অস্ট্রেলিয়ায় সুয়েজ লিওনাইজ নামে ফ্রান্সের একটি কোম্পানির হাতে পানির দায়িত্ব দেয়ার পর দূষিত পানি সরবারহ ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। আর্জেন্টিনায়ও সুয়েজ লিওনাইজের হাতে পানির দায়িত্ব দেয়ার পর পানির দাম দ্বিগুন বৃদ্ধি পায়। নিউজিল্যান্ডে পানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার পর জনতা রাজপথে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়।

প্রস্তাবিত পানি আইন: নিছক ব্যবসায়ের জন্য নয়, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় হোক
রাজনৈতিক ডম কম থেকে www.rajnoitik.com